স্বাস্থ্যখাতে বন্ধ হয়নি পুকুর চুরি : গোয়েন্দা তল্লাশির মধ্যেও চলছে লুটপাট

0
38
স্বাস্থ্যখাতে বন্ধ হয়নি পুকুর চুরি : গোয়েন্দা তল্লাশির মধ্যেও চলছে লুটপাট

রিজেন্ট ও জেকেজি প্রতারণা নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় চলছে। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ, জেকেজি’র চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এবং এমডি আরিফুল হক চৌধুরী। যদিও তাদেরকে প্রতারণার সুযোগ করে দেয়ার নেপথ্যের কারিগর স্বাস্থ্য অধিদফতরের দায়িত্বশীলরা এখনো অধরাই। শুধু কি এরাই স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে? করোনার সময়ে দেশে পিসিআর টেস্ট কিট সরবরাহ নিয়েও চলছে এক ধরণের নৈরাজ্য। অসাধু একটি সিন্ডিকেট মহামারি করোনা দুর্যোগের সময়েও বজায় রেখেছে তাদের অতি মুনাফার চিন্তা। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সিএমএসডি’র (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপো বা কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই সিন্ডিকেটটি কিট সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছে বড় অঙ্কের টাকা। এই সিন্ডিকেট প্রতিটি কিটে হাতিয়েছে ১৬শ’ ৮৮ টাকা। গত কয়েক দিন ধরে ইনকিলাবের অনুসন্ধানে কিট সরবরাহ নিয়ে নৈরাজ্যের এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সূত্র মতে, কোনভাবেই থামছে না স্বাস্থ্যখাতে সিন্ডিকেটের দৌড়াত্ম্য। কিছু ক্ষেত্রে চুনোপুটিদের আইনের আওতায় আনা গেলেও স্বাস্থ্যখাতের ঠিকাদারদের মাফিয়া হিসেবে পরিচিত মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু অধরাই থাকছে। সম্প্রতি তাকে কাজ না দেয়ায় কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক পদ ছাড়তে হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ। অথচ বর্তমান পরিচালক অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান দায়িত্ব গ্রহণ করে সেই বিতর্কিত ব্যক্তির একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়েছেন। গত ৩ জুন যোগদান করেই ১৫ জুন মিঠু সিন্ডিকটকে ৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার পিসিআর টেস্ট কিট ক্রয়ের কাজ দেন। মিঠুর মেসার্স জেরিন এন্টারপ্রাইজকে ২৩শ’ টাকা দরে ১ লাখ ৫০ হাজার স্যানশিওর বায়োটেক ব্র্যান্ডের টেস্ট কিটের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এই সময়ে আরও তিন প্রতিষ্ঠানকে কিট সরবরাহের কাজ দেয়া হয়। শুধু কাজ দেয়ায়ই সীমাবদ্ধ নয়; করোনার শুরু থেকে যে সব ঠিকাদার কিট সরবরাহ করেছে তারা এখনো বিল না পেলেও মিঠুকে কার্যাদেশ দেয়া বিল উত্তোলনে উঠে পড়ে লেগেছেন বর্তমান পরিচালক।

গত ১৫ জুন পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান স্বাক্ষরিত কার্যপত্রে দেখা যায়, মিঠুর প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেরিন এন্টারপ্রাইজকে দেড় লাখ পিস পিসিআর টেস্ট কিট সরবরাহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিটি কিটের মূল্য ধরা হয়েছে ২৩শ’ টাকা। অথচ চীনের কিট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, বেইজিং অ্যাপলাইড বায়োলোজিক্যাল টেকনোলজি কোম্পানির বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা (ডাবিøউএইচও) স্বীকৃত একটি কিটের দাম ৫০ হাজারের ওপরে সংখ্যার জন্য ৫ ডলার। চীনের এনবাও বায়োটেকনলজি কোম্পানির ডাবিøউএইচও স্বীকৃত একটি কিটের দাম ৫০ হাজারের ওপরে সংখ্যার জন্য পড়ছে ৬ ডলার। একইভাবে ডাবিøউএইচও স্বীকৃত প্রতিটি কিট চীনের নানজিং ডিনরি মেডিকেল কোম্পানি লিমিটেড এবং পেরিননিয়াল মেডিকেল বিক্রি করছে ৬ ডলারে।

প্রতি ডলারের মূল্য ৮৫ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতিটি কিটের বাংলাদেশি দাম পড়বে সর্বোচ্চ ৫১০ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট, ট্যাক্স ও বিমান ভাড়া মিলিয়ে প্রতিটি কিটে খরচ পড়বে সর্বোচ্চ আরও ১০২ টাকা। সর্বমোট খরচ দাঁড়ায় ৬১২ টাকা। অথচ সিএমএসডি থেকে দেয়া হচ্ছে প্রতিটি কিটের বিপরীতে ২৩শ’ টাকা। সিন্ডিকেটের কবলে প্রতিটি কিট বাবদ চলে যাচ্ছে ১৬শ’ ৮৮ টাকা।

কিট সরবরাহের কাজ পাওয়া অন্য তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ওভারসিজ মার্কেটিং কর্পোরেশন-ওএমসিকে ২৩শ’ টাকা দরে ১ লাখ ৫০ হাজার টেস্ট কিটের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে; যার মূল্য ৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একইভাবে মাইশা রাও টেলসেট জেভিকে ২৩শ টাকা ইউনিট মূল্যে ৫০ হাজার বায়োনির ব্র্যান্ডের টেস্ট কিট সরবরাহের আদেশ দেয়া হয়েছে; যার মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া স্টার্লিং মাল্টি টেকনোলজিস লিমিটেডকে ২১শ’ টাকা ইউনিট মূল্যে ২৫ হাজার এন্যাটোলিয়া ব্র্যান্ডের টেস্ট কিটের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে; যার মূল্য ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। চারটি কার্যাদেশের মোট মূল্য ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আমদানিকারক ইনকিলাবকে জানান, প্রতিটি কিট আমদানিতে সর্বোচ্চ সাড়ে ৬শ’ টাকা খরচ হতে পারে। এটাতো এক ধরণের পুকুর চুরি। তিনি বলেন, এই দাম করোনা শুরুর দিকে হলেও মেনে নেয়া যেতো। কারণ তখন এই কিট পাওয়া দুষ্কর ছিল। আমদানি করা কঠিন ছিল। খরচ বেশি পড়তো। দামও ছিল কিছুটা বেশি। বর্তমানে কিটসহ করোনা সামগ্রীর দাম অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, একটি সিন্ডিকেট সিএমএসডি’র ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব ঠিকাদাররাই কার্যাদেশ পেয়েছে। এই লুটপাটের সাথে স্বাস্থ্যখাতের কে কে জড়িত সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। কিট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এলসি ডকুমেন্ট, কাদের মাধ্যমে এই কাজ দেয়া হলো তা অবশ্যই জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সূত্র মতে, করোনা মোকাবেলায় দ্রুত ৪৯৮ কোটি ৫৫ লাখ ৯৮ হাজার ২শ’ টাকা অনুমোদন ও ছাড় চেয়েছেন সিএমএসডি (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপো বা কেন্দ্রীয় ঔষধাগার)। এর মধ্যে ১শ’ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এতে পিসিআর টেস্টের কিট বাবদ ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকাও আছে। গত ৫ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে লেখা এক চিঠিতে সিএমএসডি পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান এ অর্থ চেয়েছেন। যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব অবহিত আছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে কিছুই জানানো হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দরপত্র ছাড়াই সরাসরি পণ্য ক্রয়ের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে কিট ক্রয় করেও সিএমএসডির পরিচালক এক চিঠিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে জানান, করোনা মোকাবিলায় টেস্ট কিট গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন সিএমএসডিতে কিছু প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া ব্যবসা করলেও তিনি যোগদানের পর তা ভেঙে দিয়েছেন বলে দাবি করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সাপ্লাই চেন অব্যাহত রাখতে প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ের মৌখিক নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরামর্শে ডিপিএম পদ্ধতিতে উল্লেখিত চারটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে বলেও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন।

মিঠু সিন্ডিকেটকে দ্রুত টাকা পাইয়ে দিতে সিএমএসডি পরিচালক চিঠিতে উল্লেখ করেন, টেস্ট কিট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বিল না পেয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং নতুন কিট সরবরাহ করবে না। অথচ করোনার শুরু থেকে ওএমসি কিট সরবরাহ করলেও এখন পর্যন্ত একটি টাকাও পায়নি প্রতিষ্ঠানটি বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মো. জুয়েল।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যে দামে চারটি প্রতিষ্ঠানকে টেস্ট কিট আমদানির কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে, কিটের মূল্য এর চেয়ে অনেক কম। তাদের মতে, এক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা বদলানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। সবচেয়ে বড় কথা হল এ কার্যাদেশে বিতর্কিত এবং সমালোচিত একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের টাকার কাজ দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে সিএমএসডির পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) আবু হেনা মোরশেদ জামানের মোবাইলে কল করলে তিনি রিসিভ করেননি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক ইনকিলাবকে বলেন, এ বিষয়ে এখনও আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। তাই আমি কিছুই বলতে পারছি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here