জেনে নিন একাকীত্ব কাটানোর সবচেয়ে ভালো উপায়গুলো

0
11

যান্ত্রিক এই জীবন নামক গোলকধাঁধায় কখনো কখনো আমাদেরকে একাকীত্বতা গ্রাস করে ফেলে। এর শেকড় প্রথমে অল্প বিস্তারিত হলেও পরে এটি ছড়িয়ে পড়ে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ধীরে ধীরে একাকীত্বের চাদর আমাদেরকে মুড়িয়ে ফেলে। আর এই চাদররের আবরণ বেধ করা রীতিমত কঠিন হয়ে পড়ে। আর চাদরের প্রাচীর এতটাই প্রখর যে এটা আপনাকে আমাকে গুড়িয়ে দেয়। ভেঙ্গে দেয় ভেতর থেকে। কুড়ে কুড়ে খায় আমাদের ভিতরটা। একাকীত্ব এর যন্ত্রনা কতটা ভয়ংকর সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউই সূক্ষ্ম বর্ণনা দিতে পারবে না।

আমাদের জীবনে চলার পথে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। সমস্যা কাটিয়ে আবার চলতে হয় বহুপথ। এই দীর্ঘ চলার পথে দেখা দেয় সম্পর্কের টানাপোড়া। ফাটল ধরে বন্ধুত্বে। ফলে বেলা শেষে নিজেকে একা মনে হয়। আবার কখনো কখনো নিজেকে হাড়িয়ে ফেলি আমরা। তখম বড় একা মনে হয়, তুচ্ছ মনে হয় নিজের কাছে নিজেকে। বাচার স্বাদ হারিয়ে ফেলি। আর এভাবেই জমতে থাকে একাকীত্বের পাহাড়। একাকীত্ব ধীরে ধীরে বড় আকার ধারন করে এটা আমি আগেও বলেছি আর এখানেই আসল সমস্যা। একাকীত্ব আমাদের জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একাকীত্ব গ্রাস করলে আমাদের কর্মক্ষমতা কমে যায়। একঘেয়েমি ভাব চলে আসে, ফলে কাজটি আর সম্পাদন করা হয় না। সব সময় মনমরা থাকে, ফলে আমাদের জীবনের আনন্দগুলো ধীরে ধীরে কমতে থাকে। হাসি খুশী জীবনটায় আধার নেমে আসে। মুদ্রার সুখের ওপিঠটা আর আমাদের জীবনে আসে না।

একাকীত্ব একটি মানসিক সমস্যা। আর সমস্যাটি ধীরে ধীরে বড় রূপ ধারন করে। এটি অনেকের কাছেই আশংকার বিষয়। তাই মনে রাখতে হবে একাকীত্বকে আপনি যত প্রশ্রয় দিবেন এটি তত বেশি গ্রাস করতে থাকবে আপনাকে। তাই একাকীত্ব জীবনকে ঝামেলা না ভেবে মানসিকভানে শক্তিশালী হওয়া এবং এটিকে উপভোগ করা প্রয়োজন।

একাকীত্ব দূর করার চমৎকার ১০টি উপায় যা আপনার একাকীত্বকে পাশ কাটিয়ে জীবনকে উপভোগ করতে অনেক সহযোগিতা করবে।

১। সমস্যার মূলোৎপাটন করুন

আপনার সমস্যার উৎস নির্ণয় করুন। এটাই হবে আপনার প্রাথমিক কাজ। এটা কি একাকিত্ব নাকি অন্য কোনো সমস্যা, তা জেনে নিন। কেননা সমস্যা উদঘাটন করতে না পারলে সমাধান করাও সম্ভব নয়।। তাই মূল সমস্যাটি খুঁজে বের করা জরুরী। আপনার একাকিত্বের কারণ যদি হয় পুরনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা বা স্মৃতির কারণে তাহলে সেটি জেনে নিন। সমস্যার ভেতরে প্রবেশ করা এক্ষেত্রে সমাধানের উপায় বের করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। আর এটি করতে পারলেই আপনার সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়।

২। কাজটি করে ফেলুন

একবার হোচট খেলে আমরা হাল ছেড়ে দেই। এইটাই আমাদের নেচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই হোচট সামলাতে না পেরে কাজটি ফেলে রেখে আমরা ডুবে যাই নেতিবাচক ভাবনার রাজ্যে আর এই ভাবনাগুলোই একাকীত্বের সৃষ্টি করে। তখন নিজেকে বড় একা মনে হয়। চারপাশে সবাই থাকা সত্ত্বেও অবচেতন মন একাকীত্বের একটা সমীকরণ দাড় করায়। এজন্য অতীত বা পেছনে করে আসা ভুলগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন করে কাজটা শুরু করতে হবে। অতীতের সব নেতিবাচক পরিস্থিতি স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলতে একটা বড় পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এজন্য আপনার নেতিবাচক পরিস্থিতি ও দ্বীধাদ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে নিজের ওপর জোর খাটানোর প্রয়োজন হবে। এজন্য ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে হবে এবং দ্বীধাদ্বন্দ্ব বাদ দিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। এটি একাকীত্ব দূর করার অন্যতম উপায়।

৩। আপনার শখগুলোকে জাগ্রত করুন

একাকীত্বকে প্রশ্রয় দিলে এটি আপনাকে ক্রমেই তার চাদরে মুড়িয়ে নেবে। তাই একাকীত্বে ভুগলে নতুন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। এক্ষেত্রে আপনি আপমার শখগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন। কেননা নিজের শখের কাজ করতে সবারই ভালো তথা আনন্দ লাগে। তখন আমাদের মুখে হাসি ফুটে উঠে। তখন একাকীত্ব বোধটা পালিয়ে যায়। তাই আপনি যদি পশু পাখি পালন, বাগন করতে, ক্যাকটাস বা বনসাই জমাতে অথবা রান্না করতে ভালোবাসেন তাহলে বেশি না ভেবে আপনার শখের কাজগুলো পুনরায় শুরু করে দিন। তাহলে আপনার একাকীত্ব আর থাকবে না। এবং এতে ভালোভাবে সময় কাটানোর পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতাকে ঝালিয়ে নেওয়াও সম্ভব হতে পারে।

৪. সম্পর্ক গভীর করুন

একাকীত্বের মূল উৎসই হলো সম্পর্কের টানাপোড়া। বেশিরভাগ একাকীত্ব সম্পর্ক ভাঙ্গনের ফলে হয়ে থাকে। মানুষের সাথে সম্পর্ক ভালো না হলে তারা আমাদের থেকে দূরে চলে যায়। তাদের সাথে আর যোগাযোগ সম্ভব হয় না। ফলে দূরত্ব বেড়ে ওঠে। আবার আপন মানুষদের সাথে সম্পর্ক গভীর না হলে, তাদের সাথে ভালো বোঝাপড়া না থাকলে তাড়াও বেলাশেষে পর হয়ে যায়। তাদের থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। তাই দিন শেষে নিজেকে বড় একা মনে হয়। তখনই দুঃখ আমদের গ্রাস করে ফেলে। ফলে আমাদের জীবন কষ্টসাধ্য হয়ে পরে। আনন্দবিহীন জীবনের স্বাদ পানসে হয়ে পরে। তাই আমাদের সম্পর্ককে ফিকে হতে না দিয়ে সেই সম্পর্ককে আরো গভীরে রূপ দিতে হবে তাহলে মানুষগুলো আমাদের সাথে সুখে-দুঃখে সবসময়ই থাকবে এবং তখন একা লাগার সুযোগ থাকবে না। একাকীত্ব দূর করার একটি প্রধান উপায়।

৫। ইতিবাচক হয়ে এগিয়ে যান

বর্তমানে অবস্থান করে অতীরের নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে মগ্ন থাকা আমাদের করা সবচেয়ে বড় ভুল। এবং এই ভুলটা আমরা প্রতিনিয়ত করে আসতেছি। আর এই নেতিবাচক ভাবনাই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর আমরা সাফল্যের সেই শীর্ষচূড়ার রাস্তার থেকে ব্যর্থতার রাস্তায় পতিত হই। আর শুধু তাই নয় অতিতের করা ভুলগুলো মনে করে আমরা প্রতিনিয়ত কষ্ট পেয়ে যাচ্ছি। আর এসব ভাবতে ভাবতেই মনের অজান্তেই একাকীত্ব আমাদের গ্রাস করে ফেলে। তাই আমাদের নেতিবাচক ভাবনা বাদ দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোকে পুঁজি করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। ইতিবাচক চিন্তার শক্তি অনেক প্রখর। এটি আমাদের অনুপ্রেরিত করে এবং আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী করে ফলে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি একাকীত্বকেও হটিয়ে দেয়।

৬। ভ্রমন করুন

একাধারে অনেকদিন এক জাগায় থাকার ফলে আমাদের মধ্যে একঘেয়েমিভাব চলে আসে। আর একবার একঘেয়েমিভাব চলে আসলে আমাদের শরীরে অলসতা বাসা বাধে। যার ফলে আমাদের কজে হেলা হয়। সময়ের কাজ সময়ে হয়না এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কাজটি করাই হয়না। ফলশ্রুতি আমাদের অনেক বড় ক্ষতি সাধন হয়। এবং এই একঘেয়েমির ফলে একাকীত্বও আমাদের জীবনে উকি দেয়। তখন জীবনের আসল লক্ষ্য তথা আনন্দটাই হাড়িয়ে যায়। একাকীত্ব থেকে সৃষ্টি হয় ডিপ্রেশন। তাই একঘেয়েমি কাটানোর জন্য আমাদের ভ্রমন করা খুব জরুরী। ভ্রমন করার ফলে আমাদের মানসিক প্রশান্তি মেলে এবং আমাদের জ্ঞানের ভান্ডার প্রশস্ত হয়। এই জন্যই ডক্তার রুগিকে ঘুড়ে আসতে বলে। তাই একাকীত্ব দূরীকরনে ভ্রমনের বিকল্প আর কিছুই নেই। এটি একাকীত্ব দূর করার উপায় গুলোর মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

৭। ছোটবেলার কথা স্মরণ করুন

ছোটবেলার স্মৃতিগুলো খুব মধুর হয়ে থাকে। সাধারণত একাকীত্বে থাকলে মানুষের মন ভারাক্রান্ত থাকে। মনে প্রশান্তির হাওয়া বয় না। মন খারাপের রাজ্যটাই তখন সঙ্গি হয়ে যায়। ডিপ্রেশনের চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে অন্ধকার ঘরে তখন পুড়নো স্মৃতির জাল বুনে চলে। এসময় আমাদের দরকার এক চিলতে হাসি, একটু আনন্দ। হাসিই এসব রোগের ওস্তাদি টোটকা। তাই হাসার জন্য ছোট বেলার স্মৃতি মনে করা যেতে পারে। তাহলে অচিরেই মুখের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটতে বাধ্য। কেননা অনেকেরই ছোটবেলার সুখস্মৃতি দিয়ে টইটম্বুর। নানান মজার স্মৃতি দিয়েই সাজানো ছিল ছোট বেলা। তাই এসব সুখের স্মৃতি চিন্তা করলে মন ভালো হয়ে যায়। তখন আর নিজেকে একা লাগে না।

৮। বই পড়ার অভ্যেস করুন

বই আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বইয়ের মত আপন এবং নিঃস্বার্থ বন্ধু আপনি এই দুনিয়ায় খুজে পাবেন না। বই হচ্ছে জ্ঞানের ভান্ডার আর জ্ঞান অর্জন করলে সেই জ্ঞান কখনো বিফলে যায় না। জীবনে চলার পথে কোন না কোন ক্ষেত্রে সেটা কাজে লেগেউ যায়। আর বই পড়ার অভ্যাস একটি ভালো অভ্যাস। যখন মানুষ একাকীত্বতায় ভোগে তখন তারা কষ্টের সাগরে ডুবে সুখ হাতরে বেরায়। একাকীত্ব আমাদের স্বাভাবিক মানসিকতা ধ্বংস করে ফেলে। চিন্তাশক্তির পতন ঘটায়। একাকীত্ব যখন গ্রাস করে তখন বিষণ একা লাগে নিজেকে আর সেই সময়টাকে যদি বইকে বন্ধু ভেবে বই পড়ার অভ্যাস করা যায় তাহলে সময় কেটে যায় পলকেই আর একা লাগে না। বই পড়ার অভ্যাস জ্ঞানের প্রদানের সাথে সাথে আপনার একাকীত্বকেও দূর করবে। এটি একাকীত্ব দূর করার উপায় হিসেবে স্বীকৃত।

৯। ব্যায়াম করুন

একাকীত্বে ভুগলে আমাদের মন অনেক খারাপ থাকে। মন খারাপ থাকলে কোন কাজেই মন বসে না এবং কষ্টও দূর হয় না। তাই মন ভালো রাখা অত্যন্ত জরুরী। আর ব্যায়াম শুধু সুস্বাস্থের জন্যই যে কার্যকারী তা নয় মন ভালো রাখতেও ব্যায়াম বেশ উপযোগী একটি মাধ্যম। মাত্র পাঁচ মিনিট টানা ব্যায়াম করলে এন্ড্রোফিন নামক হরমন নিঃসৃত হয়। যা ১২ ঘন্টা মন ভালো রাখতে আপনাকে সহায়তা করে। আর এর জন্য যে জিমেই যাওয়া তেমন জরুরী নয়। ঘরে করা যায় এমন ব্যায়াম করলেও তা আপনার মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সহয়তা করবে। তাছাড়া অবসাদ দূর করার জন্য ব্যামের বিকল্প আর নেই। তাই মন ভালো রাখতে আপনি নিয়মিত ব্যায়াম করতে পারেন যার ফলসরূপ আপনি যেমন সুস্থ থাকবেন তেমনি মনও থাকবে চাঙ্গা।

১০। সাহায্য চান

কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে আমরা ডিপ্রেশন নামক উগ্র জালে ধরা দেই আর সেখান থেকেই একাকীত্বের সৃষ্টি হয়। তাই ব্যর্থতার তকমা কপালে না লেপতে চাইলে কর্মক্ষেত্রে সাহায্য নেয়া প্রয়োজন কিন্তু আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের সাহায্য নিতে পারি না। এক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে দ্বিধা ও লজ্জাবোধ কাজ করে। যার ফলে কোন প্রকার সহায়তা বা পরামর্শ ছাড়াই নিজের ভাবনা মত এগিয়ে যাই। যে কাজে আমাদের দক্ষতা নেই, সেই কাজে ভাবনা মোতাবেক এগিয়ে চলি। যার ফলে সেই কাজটায় সাফল্য আসে না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে পরামর্শ থেকে সব সময়ই ভালো কিছু বেড়িয়ে আসে। তাই সাহায্য নেয়া জরুরী।
পরিশেষে বলব, জীবনের এই দীর্ঘ পথ চলায় একাকীত্ব আসবেই। তাই বলে এর জালে ধরা পড়ে জীবনের মূল্যবান সময়গুলোকে নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। তাই একাকীত্বকে প্রশ্রয় না দিয়ে এবং এটাকে ঝামেলা মনে না করে উপভোগ করে নিজ গতিতে এগিয়ে চলুন, তাহলেই জীবন হবে আরো সুন্দর, আরো আনন্দের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here