জুতোর উদ্ভব কবে হয়েছিল?

0
59

জুতোহীন পৃথিবীর কথা ভাবতে গেলে ভারী বিস্ময় জাগে। জুতো ছাড়া হাঁটব কী করে! আরও অবাক হই যখন ভাবি একদা শুধু বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি হওয়া এই পরিধেয়টি দেখতে দেখতে কেমন শিল্পসমন্বিত ও সুষমামণ্ডিত রমরমা শিল্পের চেহারা নিয়ে নিল। এটা ঠিক যে বিশ্বের সমস্ত জুতোরই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। তবু রঙ, উপাদান, নকশা কিংবা বৈচিত্র্যের বিচারে এই শিল্প ধীরে ধীরে এক চিত্তাকর্ষক চেহারা নিয়েছে। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিঃশব্দে ঘটে গেছে পাদুকা বিপ্লব। ধীরে ধীরে পাল্টে গেছে জুতোর ধারণা। একসময় যা ছিল শুধু মাত্র আভিজাত্যের প্রতীক, আজ তা আমআদমির। জুতোর বা মানুষের প্রথম ‘পা-জামা’র ইতিহাস তাই আসলে পাদূকা-পূরাণের কিছু চমকপ্রদ পরম্পরা।

চল্লিশ হাজার বছর!

গোড়াতেই একটা চমকে যাওয়ার মতো খবর দিই, ডান ও বাঁ পায়ের আলাদা জুতো তৈরির ইতিহাস খুব বেশী প্রাচীন নয়। মাত্র হাজার দেড়েক বছর আগে দুই পায়ের জন্য আলাদা আলাদা জুতো তৈরি হতে শুরু করে। ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ধরে সিংহভাগ মানুষ জুতো পরতেন না। তাই একেবারে আধুনিক যুগের আগে পর্যন্ত পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার বৃহৎ অংশেরই জুতোর প্রয়োজন হত না। তবে জুতার ব্যবহার চলে আসছে কিন্তু সেই আদিযুগ থেকে। যদিও ঠিক কবে থেকে মানুষ জুতো পরছেন এই নিয়ে বিতর্ক আছে। সাম্প্রতিক কালের একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে কেউ কেউ অনুমান করছেন যে আনুমানিক ৪০ হাজার বছর আগের পুরনো প্রস্তরযুগে জুতোর উদ্ভব হয়। তবে তখন সবাই নিয়মিত জুতো পরতো এমনও নয়। আরও বেশ কিছু পরে মধ্যপ্রস্তর যুগ পেরিয়ে মানুষ নাকি জুতো পরাতে অভ্যস্ত হয়। প্রাচীনতম জুতোর যে নমুনা পাওয়া গেছে তা ছিল নরম চামড়ায় তৈরি ও পায়ের চারপাশে মোড়ানো। অনেকটা স্যান্ডাল গোছের ব্যাপার।

বিবর্তনে জুতো!

এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীনতম জুতোটির বয়স প্রায় ১০ হাজার বছর অর্থাৎ কৃষি আবিষ্কারের সময়। অবশ্য নৃবিজ্ঞানী এরিক ট্রিঙ্কোসের বক্তব্য, তার কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই জুতো পরার প্রচলন শুরু হয়। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ট্রিঙ্কোসের গবেষণাপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ৪০ হাজার বছর আগে মানুষের পায়ের এবং শরীরের হাড়ের গঠনে যে সব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে তার পিছনে ছিল জুতোর অবদান। তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তনগুলি নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্স- এই দুই প্রজাতির মধ্যেই ঘটেছিল। এরিক তাঁর গবেষণায় আরও জানিয়েছেন, এই সময় থেকেই মানুষের পায়ের পাতা উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হতে শুরু করলেও পায়ের হাড় যথেষ্ট বড়ই ছিল। এই রকম তথ্য থেকে এই এরিক সিদ্ধান্তে আসেন যে, পায়ের বিবর্তনের পেছনে ছিল জুতোর ব্যবহার। শরীরের অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে মানুষের পায়ের হাড়ের সংখ্যা বেশি। হাজার হাজার বছর ধরে ভূমি ও আবহাওয়াগত পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিবর্তনের ইতিহাস লেখা হয়েছে। সে ইতিহাসে মানুষের পায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর পায়ের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে জুতোর অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। যে সব নৃতত্ত্ববিদ এরিকের এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের বক্তব্য হল, পায়ের পাতার গড়নের পরিবর্তন জুতো থেকে নয়, সম্ভবত শ্রম বিভাজনের ফলে ঘটে থাকবে। সে ক্ষেত্রে যদি এরিকের গবেষণা ভুল হয়েও থাকে, তা হলে জুতো আবিষ্কারের সময়কাল দাঁড়ায় ১০ হাজার বছর। তবে এটা ঠিক, আদি মানবের জুতোর সঙ্গে আধুনিক জুতোর কোনও মিল নেই।

পাদুকা-পুরাণ

আরও কয়েক হাজার বছর এগিয়ে ইউরোপে আধুনিক জুতোর খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, পুরুষ ও মহিলাদের জুতোর মধ্যে তখন তেমন ফারাক ছিল না। তবে সামাজিক শ্রেণীর বিচারে জুতোর ফ্যাশান ও উপাদানে পার্থক্য ছিল। সাধারণ মানুষের জুতোর ভেতরে থাকত মোটা ও কালো চামড়ার হিল। অন্যদিকে অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা যে জুতো পরতেন তার হিল হত কাঠে তৈরি। ভারতবর্ষে এ পরিধেয় বস্তুটির ব্যবহার প্রাচীনকালেই শুরু হয়েছিল। রামায়ণ তো আসলে পাদুকা-পুরাণের ব্যাপার। রামের অনুপস্থিতিতে ভরত যে দাদার পাদুকা-যুগল সিংহাসনে রেখেই রাজ্য পরিচালনা শুরু করেছিলেন, তা আমাদের অজানা নয়। কালিদাসের ‘কাদম্বরী’ গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের নারকেলের ছোবড়ায় তৈরি পাদুকা ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

অবশেষে পূর্ণাঙ্গ

স্পেনের পুরনো গুহায় ১৫ হাজার বছর আগের আঁকা কিছু ছবিতে দেখা গেছে আদিম মানুষদের পায়ে পশুর চামড়া জড়ানো ছিল। ৫ বছর আগে হিমযুগের মানুষরাও নাকি খড়যুক্ত চামড়ায় মোড়া জুতো পরত। স্যান্ডেলের প্রথম ব্যবহার শুরু করে মিশর। সেখানকার ফারাওরা স্যান্ডেল পরে রাজকার্য সামলাতেন।

ইউরোপের রাজাদের মতোই ফারাও ছাড়া মিশরে অন্য কারও জুতো পরার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিছু গবেষকের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৫,৫০০ অব্দে পূর্ণাঙ্গ জুতো তৈরি হয়। গবেষকদের অনুমান, বিশ্বের প্রথম জুতো তৈরি হয় মধ্যপ্রাচ্যের ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকায়। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রথম জুতো তৈরি হয়েছিল। আর্মেনিয়ার এরিনিয়া ১ নামের বিখ্যাত গুহায় পূর্ণাঙ্গ জুতোর সন্ধান মিলেছে। তবে এ নিয়ে বিতর্ক আছে।

কাঠের জুতো

১৩০০ থেকে ১৬০০ শতক পর্যন্ত লেবানিজরা একধরনের কাঠের জুতো ব্যবহার করতেন, যার নাম ছিল ‘কাবকাবস’। মধ্যযুগে ব্যবহৃত জুতা দেখে নাকি এই জুতোর নকশা বানানো হয়েছিল। ১৪০০ শতকের শেষদিকে ইতালিতেও কাঠ দিয়ে এক রকমের ছোট জুতো তৈরি হত, নাম ছিল ‘চোপিনস’। মূলত মহিলাদের ব্যবহারেই জন্য তৈরি হওয়া এই জুতা ৫ ইঞ্চি মাপের হতো। ভারতে ১৭০০ শতকের দিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল কাঠের খড়ম। উনিশ শতকের দিকে ফ্রান্সে একবার কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল বিয়ের জুতা। প্রাচীন আফ্রিকার মরিসাসের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের ব্যবহৃত জুতা দেখে ফরাসিরা নবম শতকের দিকে এই জুতোর হদিশ পায়। এছাড়া জল, কাদা ও বরফে ঢাকা পথ পাড়ি দিতে ফিনল্যান্ডে গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হত আর এক ধরনের জুতো। ১৮০০ শতকের দিকে জাপানি মেয়েরা ‘ওকোবো’ নামে এক ধরনের জুতো পরতেন। সেও ছিল কাঠে তৈরি।

এশিয়া মহাদেশেও ব্যাপক হারে কাঠের জুতোর প্রচলন ছিল। ১৭০০ শতকে কাঠের তৈরি খড়ম ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। হিন্দি ‘খড়ৌঙ’ থেকে বাংলায় ‘খড়ম’ শব্দটির উৎপত্তি। সংস্কৃতে খড়মকে ‘পাদুকা’ বলে। হিন্দুধর্মে খড়মের ব্যবহার সুপ্রচলিত। তাছাড়া খড়মের এক আলাদা গুরুত্বও আছে। হিন্দুধর্মের পাশাপাশি জৈনধর্মেও ভিক্ষাজীবী সন্ন্যাসী ও সাধুসন্তেরা খড়ম ব্যবহার করে থাকেন। এক টুকরো কাঠকে পায়ের মাপে কেটে খড়ম তৈরি করা হয়। কাঠটির সামনে একটি বর্তুলাকার কাঠের গুটি বসিয়ে দেওয়া হয়। এই গুটিটিকে বুড়ো আঙুল ও তার পাশের আঙ্গুলটি দিয়ে আঁকড়ে ধরা হয়। ইদানিং পা আটকে রাখার জন্য অবশ্য কাঠের গুটির পরিবর্তে রাবার খণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে।

জুতো তুমি কার?

ইউরোপে কিছু কিছু অঞ্চলে শুধু রাজারাই জুতো পরতেন। রাজতন্ত্রে জুতো ছিল বনেদিয়ানা আর বিত্তের পরিচায়ক। কোনও প্রজার জুতো পরা রাজারা পছন্দ করতেন না। জুতো পরিহিত প্রজার খোঁজ পাওয়া গেলে তাঁকে মৃত্যদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হত। ইংল্যান্ডে জুতো তৈরির ক্ষেত্রে আইনও তৈরি করা হয়। রানী এলিজাবেথের তৈরি এই আইনে এইরকম ফতোয়া দেওয়া ছিল যে, জুতো শুধু রাজপরিবারের জন্যেই তৈরি হবে। পরবর্তীকালে সেই আইন শিথিল হলেও এমন এক মাপের জুতো তৈরির অনুমতি দেওয়া হয় যে তাতে সাধারণ মানুষের কাছে জুতো অধরাই থেকে যায়।

হাই হিল

জুতোর মধ্যে হিল ব্যবহারের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ।

ইজিপ্টে – খ্রীষ্টপূর্ব ৩,৫০০ অব্দে আঁকা ইজিপশিয়ান ম্যুরালে উঁচু হিলের দেখা পাওয়া যায়। নিম্নশ্রেণীর মানুষদের থেকে নিজেদেরকে আলাদা দেখাতে রাজা ও উচ্চবর্ণের মানুষেরা হিল জুতো পড়তেন। আর সাধারণ মানুষেরা থাকতেন খালি পায়ে। মূলত উত্সব-অনুষ্ঠানে হিল তোলা জুতো ব্যবহৃত হত। পুরুষ ও মহিলা উভয়েই হিল তোলা জুতো পরতেন। পরবর্তীকালে অবশ্য ইজিপ্টের কসাই বা মাংস বিক্রেতারাও হাই হিল জুতো পরতে শুরু করেন। এই জুতো পায়ে দিয়ে পশুর রক্ত-মাংসের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে তাঁদের সুবিধে হত।

ফ্রান্সে – হিলওয়ালা জুতোর আধুনিকীকরণ ও প্রচলন শুরু হয় ফ্রান্সে। ষোড়শ লুই প্রথম হিল তোলা জুতো পড়তে শুরু করেন। রাজার যেমন মর্জি হয়ে থাকে। তিনি ঠিক করলেন, তিনি যে জুতো পড়বেন অন্য কেউ তা পরতে পারবে না। জনসাধারণের ওপরে তাই এই ধরনের জুতো ব্যহারে নিষেধাজ্ঞা চালু হল। চতুর্দশ লুই-এর উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। নিজেকে লম্বা দেখাতে আরও পরে তিনি হিল জুতোর বহুল প্রচলন করেন। শুধু তা-ই নয়, ষোড়শ লুইয়ের বিপ্রতীপে হেঁটে তিনি পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ধরনের জুতো পরাকে বাধ্যতামূলক করেন। হাইহিল জুতোর ব্যবহার নিয়ে ফ্রান্সে নাকি গুটিকয়েক ছোট যুদ্ধও হয়েছিল। আর তাতে বেশ কিছু মানুষ মারাও যান।

ইউরোপে – পরবর্তীকালে লন্ডনের কিছু ব্যবসায়ী ফ্রান্সের হিল তোলা জুতোর অনুকরণে জুতো তৈরি করতে শুরু করেন খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজপরিবারের সদস্যদের মনে হিল জুতো জায়গা করে নেয় ফ্রান্সের মতোই জনসাধারণের জন্য তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ষোল শতকের ইউরোপে অভিজাত মহিলাদের ব্যবহৃত কিছু জুতোর হিল এতটাই উঁচু ছিল যে হাঁটার সময় তাঁদের সাহায্য করার জন্য সঙ্গে চাকর নিতে হত। এর পর থেকে লম্বা পা-ওয়ালা জুতো (রেভ শু) তৈরি হতে শুরু করে এবং ভেনিসে তা প্রবল জনপ্রিয়তা পায়। তখন মূলত বারবণিতারা এই ধরনের জুতো পরতেন। তত্কালীন রেভ শু-র হিলের উচ্চতা এতটাই হাস্যকর ও একই সঙ্গে এমন বিপজ্জনক ছিল যে মহিলাদের জুতোর হিলের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করা হয়। আসলে তখন চলতে-ফিরতে মহিলাদের উল্টে পড়ে হাত-পা ভাঙার ঘটনা আকছার ঘটছিল।

১০ ইঞ্চি হিল!

জুতোতে হিল লাগানোর স্টাইল আজও বিদ্যমান। ২০১০ সালে ফ্যাশন ডিজাইনার আলেকজান্ডার ম্যাকক্যুইন একটি ১০ ইঞ্চি উঁচু হিলের জুতো (আর্মাডিলো হিল) বানিয়েছিলেন। বিপদ এড়াতে মডেলরা অবশ্য ফ্যাশন প্যারেডে সেই জুতো পরতে অস্বীকার করেন।

জুতো নিয়ে ব্যবসা

পাদুকার প্রথম আধুনিকীকরণ ঘটে ইউরোপীয়দের হাতে। জুতো তৈরির সেলাই মেশিনের উদ্ভাবন হয় ১৮৪৬ সালে শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। ওই সময়েই চামড়া কাটাই করার মেশিনও তৈরি হয়। ইউরোপের জুতোর ইতিহাসে ১৮৫০ সাল খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই বছর থেকে জুতো আমদানী ও রপ্তানীর দ্বার খুলে যায়। তার আগে এই নিয়মে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তার পাঁচ বছর আগে থেকেই অবশ্য ইংল্যান্ডের সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জুতো তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। এলিস হাও-এর জুতো তৈরির যন্ত্রের পরে ১৮৫৮ সালে লেম্যান আর ব্লেক নামে অন্য একজন ব্রিটিশ জুতো বানানোর আধুনিক যন্ত্র তৈরি করেন। পরবর্তী কালে গর্ডন ম্যাককে লেম্যানের যন্ত্রের পেটেন্ট কিনে নেন।

গর্ডন প্রতিষ্ঠিত জুতো কোম্পানিটিই যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধে সেনাবাহিনীর জুতো তৈরি করত। যুদ্ধ পরবর্তীকালে এই কোম্পানিটি জনসাধারণের জন্য জুতো তৈরি করতে শুরু করে। যা-ই হোক, আইন প্রণয়ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইংল্যান্ড থেকে বিখ্যাত ‘অক্সফোর্ড শু’ কোম্পানির জুতো রপ্তানী হতে শুরু করে। জার্মানিও ১৪৯০ সালে তৈরি করা জুতোর অদলবদল করে ইউরোপের বাজার মাতাতে চলে আসে। পিছিয়ে ছিল না আমেরিকাও। ধীরে ধীরে সেখানকার জুতোর ব্র্যান্ড ‘মোকাসিন’ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এই জুতো আদতে উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা পরতেন। চরম ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য তাঁরা যে জুতো পরতেন তার নাম ছিল ‘মোকাসিন’। সেই জুতো আবার বিভিন্ন রঙে আঁকা হত।

মহিলাদের জুতো

আগেই বলেছি, ১৮০০ সালের আগে ইউরোপের মহিলা ও পুরুষ একই ধরনের জুতো পরতেন। জুতোর ডিজাইন বা দৈর্ঘ্য ছিল একইরকম। তার পর থেকে মহিলাদের জন্য জুতোর ওপরের অংশে চামড়ার বদলে সিল্কের কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয়। জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও বেলজিয়ামে দেদার সিল্কের জুতো তৈরি হতে থাকে।

বেলজিয়ামের তৈরি জুতোতে সিল্কের উপর নকশাও করা হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জুতো শিল্পে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। পুরুষদের জুতোর ধরন মোটামুটি একই রকমের থাকলেও এই সময় থেকেই মহিলাদের জুতোতে নাটকীয় বিবর্তন শুরু হয়।

খালি পায়ের ভারত

বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতের পাহাড়ি এলাকায়, বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ প্রবল ঠাণ্ডা ও জল থেকে পা বাঁচাতে জুতো পরতে বাধ্য হতেন। তবে যেহেতু ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলের আবহাওয়া সাধারণভাবে উষ্ণ, তাই আম ভারতীয়ের কাছে জুতোর খুব প্রয়োজন ছিল না। তাঁরা খালি পায়ে থাকতেই পছন্দ করতেন।

এই খালি পায়ে থাকাটাই ভারতের সংস্কৃতিকে পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন করে তুলেছে। পায়ের ধুলো নেওয়া, পা ছুঁয়ে প্রণাম বিশ্বের অন্য সংস্কৃতিতে কোথায়! মায়েরা বাচ্চাদের পায়ের পাতা ম্যাসাজ করে দেন, ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, গুরুদেবের পা ধুয়ে দেওয়া হয়, দেবতার ‘চরণামৃত’ বা পা-ধোওয়া জল খাওয়া হয়, অপরাধী পায়ে ধরে ক্ষমা চায়, বিদ্যাপতি লিখে ফেলেন ‘দেহি পদপল্লবমুদারম’, পায়ে গয়না পরা, পায়ে আলতা কিংবা মেহেন্দি পরা এ দেশের অন্যতম সংস্কৃতি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here