জানেন কি? এমন একটি গ্রহ আছে যেখানে বছরের চেয়ে দিন বড়?

0
101

শুক্র গ্রহ বা ভেনাস (Venus)সৌরজগতের দ্বিতীয় গ্রহ।

শুক্র গ্রহের বাংলা নাম এসেছে অসুরদের গুরু ও রক্ষক শুক্রাচার্য থেকে, এবং শুক্রাচার্য এর দিন হিসেবে এসেছে শুক্রবার।

চিত্র: সৌরজগৎ

শুক্র গ্রহের লাতিন নামকরণ করা হয়েছে রোমান প্রেমের দেবী ভেনাস (Venus, লাতিনে: উয়েনুস্‌, ইংরেজিতে: ভীনাস্‌) নামানুসারে। পৌরাণিক কাহিনীতে ভেনাস (গ্রিকঃ আফ্রোদিতি, বাংলা শুক্র) ভালকানের স্ত্রী এবং দেবপুত্র কিউপিড ও দৈনিয়্যাসের মাতা। বর্তমানে শুক্রের বিশেষণ হিসেবে ইংরেজিতে ভেনুশিয়ান (Venusian) শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর লাতিন বিশেষণ হচ্ছে উয়েনেরেয়াল্‌ (Venereal), ইংরেজি উচ্চারণে ভেনিরিয়্যাল্‌ যা আধুনিক ইংরেজি ভাষায় যৌনরোগ বোধক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই জন্য ভেনিরিয়্যাল শব্দটি এর বিশেষণ হিসেবে এখন ব্যবহৃত হয় না। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী এই গ্রহের নামের বিশেষণ হিসেবে সিথারিয়ান (Cytherean) শব্দটি ব্যবহার করেন যা গ্রিক পুরাণে উল্লেখিত দেবী আফ্রোদিতির অপর নাম সিথারিয়া থেকে এসেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি বিশেষণ হচ্ছে: ভেনারিয়ান (Venerean, Venarian), ভেনারান (Veneran) ইত্যাদি।

চৈনিক, জাপানি, কোরিয় এবং ভিয়েতনামিজ সংস্কৃতিতে এই গ্রহের নাম বলা হয় ধাতব তারা (金星) যা পৃথিবী সৃষ্টিকারী পাঁচটি মৌলিক উপাদানের নাম থেকে উৎসারিত।

সূর্য থেকে দূরত্বের দিক থেকে হিসেব করলে সূর্যের একেবারে কাছের গ্রহ হচ্ছে বুধ গ্রহ, আর এর পরই শুক্র গ্রহের অবস্থান। সকালের আকাশে একে শুকতারা এবং সন্ধ্যার আকাশে একে সন্ধ্যাতারা বলে ডাকা হয়। এর কোন উপগ্রহ নেই। এর বায়ুমণ্ডল প্রধানত কার্বনডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত। কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ শতকরা ৯৬.৫% আর নাইট্রোজেনের পরিমাণ শতকরা ৩.৫% মাত্র। এতে অতি সামান্য পরিমাণে জলীয়বাষ্প, আর্গন, কার্বন-মনোক্সাইড প্রভৃতি আছে। কার্বনডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প থাকার দরুন শুক্রের মতো পৃথিবীরও একটি গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া আছে। সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ শুক্রের বেশ কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

চিত্র: শুক্র গ্রহ

০. সূর্য যেদিকে উঠে:

শুক্রগ্রহ এবং ইউরেনাস ঘোরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে আবর্তন করে, অর্থাৎ তাদের সূর্য্য পশ্চিমে উঠে, পুবে অস্ত যায়!

চিত্র: শুক্র গ্রহ এবং ইউরেনাসের ঘূর্ণন কোণ

১) শুক্র গ্রহের আগ্নেয়গিরি (Venusian Volcanoes):
 সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহের তুলনায় শুক্র গ্রহে আগ্নেয়গিরির পরিমাণ বেশি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তার পৃষ্ঠে ১৬০০টির অধিক আগ্নেয়গিরির সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু সম্ভবত আরো অনেক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে শুক্র গ্রহে, যাদের সম্পর্কে আমরা আজও জানি না। সুপ্ত মনে হলেও বিজ্ঞানীদের ধারণা এই আগ্নেয়গিরিগুলো যেকোনো সময় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

২) বছরের তুলনায় দিন বড়:
 শুক্র গ্রহের একটি দিন পৃথিবীর ২৪৩ দিনে স্থায়ী হয় (এক আবর্তন পূর্ণ করতে শুক্র গ্রহের লাগে ২৪৩ আর্থ ডে)। যেখানে শুক্রের এক বছর (২২৪.৭০১ দিন) সমান পৃথিবীর (৩৬৫.২৫৬ দিন) (সূর্যকে প্রদক্ষিণের সময় অনুসারে)।

৩) শুক্র, পৃথিবীর টুইন:
 সৌর জগতের সকল গ্রহের মধ্যে শুক্র আর পৃথিবীর মাঝে রয়েছে অনেক মিল যার কারণে শুক্র গ্রহকে পৃথিবীর যমজ বলা হয়। দুটি গ্রহই প্রায় সমান আকারের। তাছাড়া পৃথিবী এবং শুক্রের মধ্যে গাঠনিক উপাদান এবং আচার-আচরণে বড় রকমের মিল রয়েছে। এর দৈহিক গঠন পৃথিবীর মত শক্ত। এর ভর পৃথিবীর ০.৮২ গুণ আর ব্যাস পৃথিবীর ০.৯৫ গুণ। এর গড় ঘনত্ব ৫.১ যাপৃথিবীর ঘনত্বের চেয়ে সামান্য কম। সৌর জগতের যেকোনো গ্রহের তুলনায় শুক্রও পৃথিবীর কক্ষপথ সবচেয়ে নিকটস্থ অবস্থানে রয়েছে। উভয় গ্রহের রয়েছে অপেক্ষাকৃত নবীন পৃষ্ঠতল এবং সেই সঙ্গে উভয় গ্রহের রয়েছে মেঘে পূর্ণ ঘন বায়ুমণ্ডল। (যদিও শুক্রের মেঘ বেশিরভাগ বিষাক্ত সালফিউরিক এ্যাসিড সমৃদ্ধ)। শুক্রে দিনরাত মুশুলধারে বৃষ্টিপাত হয়। শুক্রে যে বৃষ্টি হয়, তা এ্যাসিড বৃষ্টি।

৪) অতিমাত্রায় গরম:
 শুক্র গ্রহ তার বায়ুমণ্ডল অধিক পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড পূর্ণ হওয়ায় চরম গ্রিনহাউজ এফেক্ট শুক্র গ্রহের পৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে চলেছে। তাপমাত্রা ৮৭০ ডিগ্রী ফারেনহাইট (৪৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস) অবধি পৌছতে পারে। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজের অধিক মাত্রার কারণেএই গ্রহের উপরিতল সীসাকে দ্রবীভূত করার মত যথেষ্ট গরম। নাসা’র জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির একজন বিজ্ঞানী তার একটি বিবৃতিতে এ খবর জানান।

৫) প্রেসার কুকারের অনুরূপ:
 শুক্র গ্রহের বায়ু শুক্র গ্রহের পৃষ্ঠের উপর বায়ুর চাপ খুব বেশি। পৃথিবীর সমুদ্র স্তরের চাপের তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ বেশি। অন্য কথায়, শুক্র গ্রহের চাপ পৃথিবীর সমুদ্রের জলের চাপের অনুরূপ, প্রায় এক মাইলের অর্ধেক(১ কিমি)।

৬) শুক্র সূর্যকে অতিক্রমকারী একটি গ্রহ:
 সূর্যের উপর দিয়ে কোন গ্রহের অতিক্রম করার বিষয়টি একটি দুর্লভ মহাজাগতিক ঘটনা। শুক্র অন্য গ্রহের তুলনায় বিরল একটি গ্রহ, কারণ শুক্র সূর্যের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমকারী একটি গ্রহ! শুক্র গ্রহের এই ধরনের পরিক্রমনকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ট্রানজিট অব ভেনাস’। শুধু শুক্র ও বুধ পৃথিবীর অনুকূল অবস্থান থেকে এই কাজটি করে থাকে। শুক্রকে এমন করে গমন করতে খুব কমই দেখা যায়। বুধ ওশুক্র গ্রহের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের উপর হেলানো রয়েছে বলেই পৃথিবী থেকে আমাদের সৌরজগতের এই দুটি গ্রহের ট্রানজিট দেখা সম্ভব। এই অসাধারণ দৃশ্য ২০১২ সালের ৫,৬ জুন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকার পূর্বাঞ্চল থেকে দেখা গেছে। দূরবীন আবিষ্কারের পর সপ্তমবার শুক্রের এই অতিক্রমণের সাক্ষী হতে পেরেছে মানুষ।

৭) উজ্জ্বল গ্রহ:
 যদিও শুক্র সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ নয় কিন্তু, এটি পৃথিবীর নিকটে অবস্থান করায় আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ হিসেবে বিরাজ করে। পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থানের দরুন একে আমাদের আকাশে সবসময় সূর্যের কাছাকাছি দেখা যায়; সূর্য থেকে এর সর্বোচ্চ কৌণিক দূরত্ব হতে পারে ৪৮ ডিগ্রি। এটি সূর্য থেকে ১০.৮২ কোটি কিলোমিটার আর পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রাতের বেলা চাঁদের পর এটি আকাশের দ্বিতীয় উজ্জ্বলবস্তু হিসাবে যোগ্যতা অর্জন করেছে।

৮) একটি প্রাচীন রহস্য:
 শুক্র গ্রহকে হাজার বছর ধরে পর্যবেক্ষণের একটি টার্গেটেরাখা হয়েছে। প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা ১৬০০ বিসি এর কোনো এক সময় শুক্র গ্রহের আকাশে উদ্দেশ্যহীন ভ্রমেণের কথা রেকর্ড করেছিলেন। গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাস সকালে ও সন্ধ্যায় আকাশে উজ্জ্বল তারকাটি যে আসলে একই বস্তু শুক্র ছিল তা আবিষ্কার করেন। আমাদের আকাশের সকল গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে ইতিহাসের সর্বত্র শুক্র সবচেয়ে চর্চিত এবং জল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

৯) শুক্রের বাতাস খুবই ভারি:
 অবাক করার বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর দ্রুততম টর্নেডোর তুলনায় দ্রুততর শুক্রের বাতাস! এর বাতাস অতিদ্রুত গতিতে মাঝখানের মেঘের স্তরের মধ্যে এক ঘন্টায় প্রায় ৪৫০ মাইল।

১০) শুক্র গ্রহের পর্যায় (ফেজ) আছে:
 শুক্র যখন সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে তখন এর পুরো পর্যায় থাকে। আবার পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে এটি নতুন ফেজ বা পর্যায়ের প্রদর্শিত করে। ১৬১০ সালে এই পর্যায়ক্রমের প্রথম স্বাক্ষী ছিলেন ইতালীয় জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও।

চিত্র: শুক্র গ্রহের গঠন

সহায়িকা (আরো জানার জন্য):

১. Venus | Facts, Information, History & Definition
২. What direction do planets rotate? (Beginner)
৩. অদ্ভুত এক গ্রহ
৪. In Depth | Venus – NASA Solar System Exploration
৫. Venus – Wikipedia
৬. Planet Venus Facts: A Hot, Hellish & Volcanic Planet

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here