গাজীপুরের ২৭৫টি বাজার করোনা হটস্পট

0
12

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকিতে গাজীপুরের ২৭৫টি বাজারের লাখ লাখ ক্রেতা। সংক্রমণ ঝুকিতে আছেন বিক্রেতারাও। বাজারগুলোতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই। নেই গাজীপুর জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের নজরদারি। অথচ লকডাউন চলাকালে এসব বাজার নিয়ন্ত্রণ না করলে গাজীপুরে করোনা ভাইরাস জনে জনে সংক্রমিত হয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ।

গাজীপুর জেলা বাজার কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর ৩০টি এলাকায় বাজার (সবজি, মাছ ও মাংসসহ অন্য নিত্যপণ্য) ইজারা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসনের ইজারা দেওয়া বাজার সংখ্যা ২২টি। দফতরটির তালিকা অনুসারে, ‘গাজীপুর নগরসহ জেলায় সর্বমোট বাজার সংখ্যা ২৭৫টি।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুর নগরীর ভোগড়া বাইপাস এলাকায় সবজি আড়তে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। একই চিত্র নগরীর অন্য কাঁচাবাজারগুলোতে। মাছ বাজারগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। একই চিত্র দেশি-বিদেশি মুরগির দোকানগুলাতে। অথচ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে এসব বাজারে সামাজিক দূরত্ব মানছেন না ক্রেতারা। বাজার কমিটিও নীরব ভূমিকায়।

সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের নূন্যতম নজরদারিও নেই এসব বাজারে। বাজারগুলোতে নিত্যদিন লাখও ক্রেতার সমাগম হলেও তা নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। অথচ গতকাল (১৬ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার) সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬১ নম্বর আইন) এর ১১ (১) ধারার ক্ষমতা বলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রামণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

একই দিন দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি নতুন করে গাজীপুরে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে গাজীপুরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ১১ তারিখ জেলাটিকে অবরুদ্ধ (লকডাউন) ঘোষণা করেছেন জেলাপ্রশাসক। এর পরও শুক্রবার (১৭ এপ্রিল ২০২০) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ‘গাজীপুরে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১০ জন।’ এ ছাড়া গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, ‘গাজীপুরে শুধুমাত্র কাপাসিয়া উপজেলাতেই ৩৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।’ এর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী ১৩ জন। এছাড়া জেলায় আরও ৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ সদস্যও।

জেলায় কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন ডাক্তার, নার্স, সাংবাদিক, হাসপাতাল কর্মচারিসহ বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষ। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে কাপাসিয়ার ৫টি বাজার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা (ঔষধের দোকান ব্যতীত) করেছে উপজেলা প্রশাসন। অথচ গাজীপুর নগর এবং অন্য উপজেলার বাজারগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় ঠেকাতে দৃশ্যত ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।

গাজীপুরের বিভিন্ন বাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নিত্যপণ্যের বাজার প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে বেলা বারটা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাজার খোলা রাখার স্বল্প সময় নির্ধারণ হওয়ায় নিত্যদিন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লেগে থাকছে।

বিশেষ করে, সকাল নয়টা থেকে বেলা বারটা পর্যন্ত বাজারগুলোতে একসঙ্গে অগণিত ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের জন্য আসছেন। এতে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি বেড়েছে। অথচ সরাদিন বিশেষ করে সবজি বাজার খোলা থাকলে সমাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা।

গাজীপুরে নিত্যপণ্যের বাজারগুলোর পাশাপাশি টিসিবি পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর সামনে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ’ বা টিসিবির গাজীপুরে ছয়জন ডিলার নগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ন্যায্যমূল্যে সায়াবিন তেল, ডাল, ছোলা ও চিনি বিক্রি করছে। টিসিবি পণ্যবাহী এসব ট্রাকের সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা সামাজিক দূরত্ব না মেনে পণ্য ক্রয় করছেন।

ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে অসহায় বিক্রেতারা। গাজীপুরের উপজেলাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে কাপাসিয়া করোনার হটস্পট। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল ২০২০) কাপাসিয়ার পাঁচটি বাজার অনির্দিষ্টাকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন। কাপাসিয়ায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি সত্ত্বেও টিসিবি পণ্য বিক্রি কার্যক্রম চালু রাখার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারছে না।

এ ব্যাপারে কৃষকনেতা আলতাফ হোসেন যোগফলকে বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের দিতে খেয়াল রেখে এক সঙ্গে বেশি পণ্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে বারবার জনগণ বাইরে যাবে না।

কাপাসিয়ায় জুনিয়া এলাকায় টিসিবি ডিলার (জোনাকী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড) মেহেদী হাসান জানান, টিসিবি পণ্য ঢাকা তেজগাঁও থেকে উত্তোলণ করে কাপাসিয়ায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে তার জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে। ট্রাকের সামনে শত শত ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকছে। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কিছুদিনের জন্য টিসিবি পণ্য বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করছেন।

ভিন্নমত শ্রমিক সংগঠক আশরাফুজ্জামানের। তার মতে, কার্যক্রম বন্ধ করলে জনগণের উপায় কি হবে। নিয়ম মানানো উচিত। যাতে সকলেই টিকে থাকতে পারে।

নগরীর বোর্ডবাজার এলাকায় টিসিবি ডিলার (আরপি ট্রেডার্স) রতন মল্লিক জানান, অগণিত ক্রেতার সমাগমে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা অসম্ভব। পণ্য বিক্রি না করলে কিছু নেতা ও তাদের যোগসাজসে কিছু ক্রেতা অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। পারলে হামলা করতে আসে। বর্তমানে ডিলারশিপ রক্ষা করতে গেলে করোনায় আক্রান্ত হতে হবে, এমন আশঙ্কা তার। অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও টিসিবি পণ্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করছেন। অথবা পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়ন জরুরি।

এ ব্যাপারে আইনজীবী কাজী মাজেদুল আলম যোগফলকে বলেন, আমরা সাধারণত সহজে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক কড়াকড়ি আরোপই বেশি জরুরি বর্তমান পরিস্থিতিতে।

গাজীপুর নগরীর চান্দনা চৌরাস্তায় টিসিবি ডিলার (জারাসারা এন্টারপ্রাইজ) শান্ত জানান, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে তিনি টিসিবি পণ্য বিক্রি করছেন। তবে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা জটিল হয়ে পড়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নগরীর কোথাও কোনও দোকানপাট খোলা থাকলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক নির্বাহি কর্মকর্তা এবং নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেটরা বাজার মনিটরিং করছে।

অন্যদিকে গাজীপুর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মামুন সর্দার জানান, ‘ক্রেতারা সচেতন না হলে মোবাইল কোর্টের অভিযান পরিচালনা করেও কাজ হবে না। তা ছাড়া নগরের বাজারগুলো মনিটরিংয়ের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।’ বাজারের সময় কম বেধে দেওয়ায় ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে বলে ক্রেতা বিক্রেতাদের অভিমত। এ ব্যাপারে কিছু করণীয় আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও জানান, ‘প্রতিদিন বাজারে যেতে হবে কেন? আগে ক্রেতাদের সচেতন হতে হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here