কাফকোর টাকা হরিলুট

0
60

বহুজাতিক শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্নফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে (কাফকো) মানবসম্পদ পরামর্শক (কনসালটেন্ট এইচআর) নামে কোনো পদ ছিল না। এম এ হালিম কোম্পানিটির চেয়ারম্যান থাকাকালে গত ফেব্রুয়ারিতে পদটি সৃষ্টি করা হয় বোর্ড বসিয়ে। এর পর এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বেতন মাসে সাড়ে চার লাখ টাকা। তার কর্মক্ষেত্র কাফকোর ঢাকাস্থ কার্যালয়। অথচ সেখানে তার জন্য একটি কক্ষ পর্যন্ত বরাদ্দ নেই। তিনিও সেখানে নিয়মিত আসেন না। চুক্তিকৃত এক বছরে তাকে বেতন হিসেবে ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে কাফকোর। এ পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম কায়সারুল ইসলাম। তিনি অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব।

    
প্রায় একই সময়ে কাফকোতে ৩০ জনকে চাকরি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে শুধু ১৬ জনের কাছ থেকেই অনৈতিকভাবে নেওয়া হয়েছে এক কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর এ অপকর্মে কাফকোর তৎকালীন সিবিএ নেতাদের একটিং অংশও সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, সাবেক চেয়ারম্যানকে খুশি করতে চীফ করপোরেট অফিসার রবিউল হক চৌধুরী ও এইচআর মহাব্যবস্থাপক মীর রাজিউর রহমানের যোগসাজশে কনসালটেন্ট এইচআর নামের পদটি সৃষ্টি করা হয়; অন্যান্য পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়।
    
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রবিউল হক চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংযোগ কেটে দেন। রাজিউর রহমান অবশ্য কথা বলেছেন। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, কাফকোর একজন মাইক্রোবাস চালকের বেতনও দেড় লাখ টাকা। তাই এ চাকরির অনেক গুরুত্ব। আমার হাত দিয়ে সবার চাকরি হয়েছে এটা ঠিক। পরে তা বোর্ডে অনুমোদন হয়। টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যা কিছু লিখবেন, ইমানের সাথে লিখবেন।’ কনসালটেন্ট এইচআর কায়সারুল ইসলামের বিষয়টি নিয়ে না-লেখার অনুরোধও করেন কাফকোর এই এইচআর মহাব্যবস্থাপক।

জানা যায়, এইচআর কনসালটেন্ট পদে নিয়োগ পাওয়া কায়সারুল ইসলাম চাকরিজীবনে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করলেও মানবসম্পদ উন্নয়ন কিংবা এ ধরনের কাজে তার বিশেষ অবদানের বিষয়টি জানা যায়নি। তিনি কাফকোর অফিসে নিয়মিত আসেন না; সপ্তাহে দুএকদিন এলেও রাজিউর রহমানের সঙ্গে গল্পগুজব করে চলে যান। কায়সারুল ইসলামের সঙ্গে তার এ চাকরি নিয়ে কথা বলার জন্য আমাদের সময় থেকে তাকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। মানবসম্পদ মহাব্যবস্থাপক মীর রাজিউর রহমানও একজন প্রকৌশলী, মানবসম্পদ বিষয়ে পেশাগত দখল নেই তার।
    
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাফকোর এক কর্মকর্তা বলেন, কাফকোর সাবেক চেয়ারম্যান এম এ হালিমের বাড়ি বরিশাল। মানবসম্পদ মহাব্যবস্থাপকের এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এইচআর কনসালটেন্ট কায়সারুল ইসলামের বাড়িও বরিশাল। বহুজাতিক মালিকানাধীন সার কারখানা কাফকোর ৪৩ শতাংশের মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের। একক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ শেয়ারের মালিক হিসেবে সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পদাধিকার বলে কাফকোর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জানতে চাইলে কাফকোর বর্তমান চেয়ারম্যান কে এম আলী আজম আমাদের সময়কে বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে কিছু নিয়োগ হয়েছে। এসেই সেসব বিষয়ে জানতে শুনেছি। তবে এখনো এসবের ভিতরে ঢুকিনি আমি।
    
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশিদের খুব বেশি অভিযোগ না থাকায় নানা অজুহাতে কাফকোর টাকা খরচ করা এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাফকো প্লান্টে বোর্ড মিটিং চলাকালে তৎকালীন চেয়ারম্যানের ছেলে ও তার বন্ধুদের বান্দরবনের বিলাসবহুল রিসোর্টে পাঠানো ও থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ব্যবহার করা হয় কাফকোর যানবাহন। ভ্রমণ বিলাস শেষে চেয়ারম্যানের ছেলে ও তার বন্ধুদের কাফকোর টাকায় উপহার দেওয়া হয় ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসহ নানা দামি সামগ্রী।

অর্থ নয়ছয়ের প্রতিবাদ জানিয়েছে ক্যাব
    
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এক বিবৃতিতে কাফকোর অর্থ এভাবে নয়ছয় করার প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনের নেতারা বিবৃতিতে বলেন, কাফকো কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে তোলায় নদীটি ও এর দুপাড়ের পরিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে। আশপাশের অনেক মানুষ তাদের বসতি ও জীবিকা হারিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এসব এলাকার অধিবাসীদের জীবন-জীবিকাসহ পরিবেশ রক্ষায় কাফকোর আর্থিক সহযোগিতা করাই ছিল যুক্তিসংগত। অথচ কাফকোর বিদায়ী বোর্ড চেয়ারম্যানকে তুষ্ট করতে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আশ্রয় নেওয়া হয়েছে অসদুপায় ও অনিয়মের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here