করোনা’ভাইরাস : কী ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশে’র সামনে

0
7

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও যে বাড়তে থাকবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হলো- সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে? এবং কোন পর্যায়ে এসে এই হার কমতে শুরু করবে?

এ সম্পর্কিত একটি মডেল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) হাতে রয়েছে। কিন্তু জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে সেই বিবেচনায় এই মডেলটি সরকার বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আনতে চাইছে না।

এ বিষয়ে ভাইরোলজিস্ট ড. নজরুল ইসলাম বিবিসি বাংলা’কে বলেন, ‘এক দিক থেকে ঠিক কাজটিই করা হয়েছে। কারণ এই মুহূর্তে প্রজেকশন (পূর্বাভাস) করার মতো যথেষ্ট ডেটা (উপাত্ত) পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস রোগীদের কাছ থেকে নমুনা-‘রস সংগ্রহের কাজে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। একদিন নমুনা সংগ্রহ করে আরেকদিন তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে অন্য এক দিন। ফলে এর থেকে এখনই কোনো সুনির্দিষ্ট মডেল তৈরি করা কঠিন।’

এর পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে আসা অনেক উপাত্ত ‘সিস্টেম ‘লস’ এর শিকার হচ্ছে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন ড. নজরুল ইসলাম।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং সম্ভাব্য মৃত্যু’র হার নিয়ে গত ২৬ মার্চ জাতিসংঘের তৈরি একটি ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল রিপোর্ট বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। এতে পূর্বাভাস করা হয়, বাংলাদেশে জনঘনত্বের বিবেচনায় করোনাভাইরাসে পাঁচ লা’খ থেকে ২০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

পূর্বাভাসের সমস্যা

কিন্তু এই পূর্বাভাসে একটি শর্ত ছিল। আর সেটি হলো- করো’নাভাইরাসের বিস্তার, প্রশমন এবং অবদমনে সরকারের তরফে একেবারেই যদি কোনো ধরনের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলেই কেবল এই পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

বিবিসি বাংলার সঙ্গে আলাপকালে রোগতত্ত্ববিদ ড. এ. এম. জা’কির হোসেন বলছিলেন, এই ধরনের পূর্বাভাসের কিছু সমস্যা রয়েছে। তিনি জানান, সংক্রমণ বিস্তারের কিছু শর্ত রয়েছে। এগুলো হলো- রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, সংক্রমণের হার, আরোগ্যের হার, মৃত্যুর হার এ’বং রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছেন এমন জনসংখ্যা।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘চীনের এক হিসাব মতে, করোনাভাই’রাসে যারা মারা যাবেন তাদের মধ্যে ৭১ থেকে ৭৯ শতাংশ মারা যাবেন অন্য কোনো রোগে, যাকে ‘কো-মরবিডিটি’ বলা হয়। যেমন, হার্টের সমস্যা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনা হিসাবটিকে ব্যবহার করে আমরা ধরে’ নিতে পারি করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার পর যাদের বয়স ৬০ বছর বা তার ঊর্ধ্বে, এমন ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ কো-মরবিডিটিতে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।’

ড. জাকির হোসেন বলছেন, ‘এটা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কি’ছু নেই। বাংলাদেশে মৃত্যুহার হচ্ছে প্রতি ১০০০ জনে পাঁচ জন। অর্থাৎ প্রতিবছর নানা কারণে নয় লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে একটি চিত্র পাওয়া যাবে সংক্রম’ণের হারের দিকে নজর রাখলে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার যদি ‘এক্সপোনেনশিয়াল’ হয় তাহলে সেটা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে বলে তারা স্বীকার করছেন।

এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথের একটি চিত্র পাওয়া যায় সেন্টার ফ’র ইনকুয়ারিতে প্রকাশিত ভিনোদ ভরদ্বাজের একটি নিবন্ধ থেকে।

এখানে তিনি লিখছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ মার্চ স্থানীয়ভাবে করোনা’ভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ছিল ১৫ জন। কিন্তু সারা দেশে লকডাউন থাকার পরও পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬০ হাজার।

‘১৩ কোটি আক্রান্ত হতে পারে’

বাংলাদেশে সংক্রমণের বিস্তার এক্সপোনেনশিয়াল হচ্ছে কিনা ‘তার চিত্রটি এখনো পরিষ্কার না। প্রথম দিকের বৃদ্ধি এক্সপোনেনশিয়াল বলে মনে হলেও কয়েকদিন দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।

তবে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি ‘গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক ড. মলয় মৃধা ও রিনা রানী পাল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দীপক কে. মিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক দুজন গবেষক মিলে যে রিপোর্টটি তৈরি করেন তাতে বলা হয় ১৩ কোটি মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।

জাতিসংঘের নথির মতোই এই রিপোর্টে ধরে নেওয়া হয়, এই হা’রে সংক্রমণ ঘটবে যদি এই ভাইরাস মোকাবিলায় ২৮ মের মধ্যে একেবারেই কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হয়।

তবে এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এটি নিয়ে তীব্র ‘বিতর্ক শুরু হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ বিবৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে এটি তাদের কোনো গবেষণা নয়।

সারা দেশ ঝুঁকিপূর্ণ

বাংলাদেশে সংক্রমণ বিস্তারের এই পটভূমিতে সরকার গত ১৬ এপ্’রিল সারা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। সংক্রমণ রোধে একমাত্র কার্যকর পন্থা; জনসাধারণের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা ও সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কিছু নতুন বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। এতে জরুরি কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ঘর থেকে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

আইইডিসিআরের একজন উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাং’লাদেশে সংক্রমণের হার যে বাড়ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নানা ধরনের পদক্ষেপ দিয়ে এই সংখ্যাকে কীভাবে নামিয়ে আনা যায় তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিভাগের এখন চরম পরীক্ষা চলছে।’

তিনি বলেন, ‘সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে আরও অনেক বেশি কমি’উনিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় সরকারের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা এখনো বেশ কার্যকর কিন্তু শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা মূলত বেসরকারি খাতে। ফলে সেখানে জরুরি ভিত্তিকে তৎপরতা বাড়াতে ‘হবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি সম্পর্কে গাণিতিক পূর্বাভাসের সুযোগ এখনো বেশ সীমিত। কারণ এ বিষয়ে আমাদের নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা। আর একেক দেশে এই ভাইরাস একেকভাবে ছড়াচ্ছে। ফ’লে এক দেশের মডেল অন্য দেশে প্রয়োগ করা কঠিন।’

ভাইরোলজিস্ট ড. নজরুল ইসলাম মনে করেন, সংক্রমণের বিস্তার ‘সম্পর্কে জানতে হলে করোনাভাইরাস পরীক্ষার পরিধিকে আরও বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস শিগগিরই কমে যাবে একথা মনে করার কোনো কারণ নেই। এটা অবশ্যই বাড়বে কিন্তু প্রশ্ন হলো আম’রা এটাকে ঠিক কতখানি বাড়তে দেব।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here