আমরা কোন প্রাণীর থেকে বিবর্তিত হয়েছি?

0
17

আমরা, মানবজাতি, কোন প্রাণী থেকে এলাম?

এর উত্তরে যদি বলা যায় ‘এপ’ জাতীয় কোনও প্রাণী থেকে তাহলে সঠিক উত্তর হয় ঠিকই কিন্তু খুবই অসম্পূর্ণ উত্তর হয়ে থেকে যায় কারণ তারপরেই প্রশ্ন ওঠে, সেই এপ কোথা থেকে বা কার থেকে এলো?

এই যে বিবর্তনের বহুশতকোটি বছরের যাত্রাপথ, তার মাঝখান থেকে হঠাৎ করে একটি প্রাণীর (আমি এরপর থেকে প্রাণী না বলে ‘জীব’ বলব) নাম না বলে আমরা চলে যেতে চাই একেবারে শুরুতে। শুরুতে ঠিক কি ছিল আর সেই থেকে কিভাবে মানুষ এল? আমরা এলাম কোথা থেকে আর কিভাবে?

তাহলে চলুন, দেখে নেওয়া যাক পৃথিবীতে জীব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস যার প্রথম অধ্যায় হল প্রাণের সূচনা এবং শেষ অধ্যায় আমরা।

আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে জন্ম হয় পৃথিবীর অর্থাৎ মহাবিশ্বের জন্মের প্রায় ৯২০ কোটি বছর পরে। এই ৯২০ কোটি বছরের ইতিহাস লিখছেন পদার্থবিজ্ঞানীরা। ব্রহ্মাণ্ডসৃষ্টির একেবারে আদিম মুহূর্ত বাদে তার পরের বেশীরভাগটাই পদার্থবিজ্ঞান অনেকটা ব্যাখ্যা করতে পেরেছে। সেখান থেকেই আমরা জেনেছি কিভাবে এলো মৌলিক কণা, পরমাণু, নক্ষত্র, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, তার মধ্যে সূর্য ও তার পরিবার যার একটি গ্রহ হল পৃথিবী। হাইড্রোজেন সৃষ্টি হয়েছিল ব্রহ্মাণ্ডের জন্মের আদি লগ্নেই। অনেক পরে বিরাট কোনও তারার অন্তরে নিউক্লীয় সংযোজন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ইত্যাদি। সেই তারার সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ধুলার থেকে তৈরি হল সূর্য ও আমাদের পৃথিবী।

এই পথেই পৃথিবীতে এলো কিছু অমূল্য উপাদানঃ কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন। এইগুলিই, প্রধানত কার্বন, হল জীবনসৃষ্টির মূল একক। এই সামান্য পরমাণুগুলি থেকেই ৪৫০ কোটি বছরের এক্সপেরিমেন্টের ফলে এলাম আমরা। সেই ইতিহাস লিখছেন জীববিজ্ঞানীরা।

আদিম পৃথিবীর অশান্ত পরিবেশে এই মৌল পদার্থগুলির মধ্যে শুরু হল নানা ধরণের রাসায়নিক বিক্রিয়া। এর ফলে তৈরি হল মিথেন, অ্যামাইনো অ্যাসিড, লিপিড ইত্যাদি এবং এর পরের ধাপে আরও জটিল জৈবযৌগ যেমন প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড। এগুলিই হল পৃথিবীর বুকে প্রাণের প্রথম বীজ।

লিপিড

প্রোটিন

নিউক্লিক অ্যাসিড

লিপিডের একটি নির্দিষ্ট গঠন-ই হল প্রথম প্রাণের আদিচিহ্ন। একে বলা হয় ‘প্রোটোসেল’ বা ‘আদিকোষ’। এর থেকেই বিবর্তিত হয়ে ভবিষ্যতে তৈরি হল সেল বা কোষ। এই কোষকেই প্রথম প্রাণ হিসেবে মনে করা হয় যার উদ্ভব হয় প্রায় ৪২৮ কোটি বছর আগে।

এই আদিম প্রাণ সৃষ্টির কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই আবির্ভাব হল আমাদের পূর্বপুরুষের। আমাদের সবার, সমগ্র বর্তমান জীবজগতের পূর্বপুরুষের। এরা ছিল একটু জটিল ধরণের এককোষী জীব যারা এসেছিল প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে। একে বলে আমাদের Last universal common ancestor (LUCA)

এই LUCA ছিল ‘প্রোক্যারিয়ট’ অর্থাৎ কোষ-অঙ্গাণুবিহীন কোষ। এর থেকে প্রায় ২১০ কোটি বছর আগে এল ‘ইউক্যারিয়ট’ অর্থাৎ কোষ-অঙ্গাণুযুক্ত কোষ।

এই ইউক্যারিয়টদের বিবর্তন ঘটতে থাকল প্রায় ২০০ কোটি বছর ধরে। এই বিরাট বিবর্তনের ধারায় অগণনীয় শাখা-প্রশাখায় সৃষ্টি হল আজকের পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য। সেই ‘জীবনের গাছ’ (Tree of life)-এর নির্দিষ্ট শাখা ধরে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে ইউক্যারিয়ট থেকে আমাদের আগমনে পৌঁছাতে।

নীচের চিত্রগুলিতে লাল বুদ্বুদ (Red bubble) গুলি অনুসরণ করুন।

অবশেষে আমরা এসে পৌঁছালাম আমাদের সময়ে…

তাহলে বোঝা গেল আমরা কোথা থেকে এসেছি। ব্রহ্মাণ্ডসৃষ্টির আদি মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়েছে আমাদের ইতিহাস। মহাকালের ধারায় আমরা এসে পৌঁছেছি আজকের অবস্থায়। প্রকৃতিমাতার ১৩৭০ কোটি বছরের এক্সপেরিমেন্টের ফল হলাম আমরা। এই মহাকায় বিবর্তনের ধারায় কত লক্ষ-কোটি জীব এসেছে যুগে যুগে…বেশীরভাগই হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে। তাই আমাদের হতে হবে বিনম্র। আমরা হয়ত অন্যদের থেকে বুদ্ধিবৃত্তিতে সামান্য বেশী এগিয়েছি কিন্তু বিশ্বপ্রকৃতির খেলার ঘরে আমাদের অবস্থান অসম্ভব তুচ্ছ। কিন্তু একইসাথে আমরা নিজেদের অসাধারণ সৌভাগ্যবান ভাবতে পারি যে এই মহান নকশার মধ্যে আমরাও স্থান পেয়েছি। উপনিষদে কথিত ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (সমগ্র বিশ্বই একটা পরিবার) বাণীকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং জগতজুড়ে ধ্বংসলীলায় রাশ টানতে হবে ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ নামক এপ প্রজাতিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here