‘অ্যাসপারগার্স সিনড্রোম’ বলতে কী বোঝায়?

0
10

সালটা ১৯৪৪। অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ হান্স অ্যাসপারগারের চেম্বারে এক মা তাঁর সন্তানদের নিয়ে এলেন। তাও একজন দু’জন নয়, একসাথে একেবারে চার ছেলে। মায়ের থেকে রোগের সমস্ত খুঁটিনাটি জানার পর, ডঃ অ্যাসপারগার বুঝতে পারলেন এই চারটি ছেলের মধ্যেই একইরকম কিছু অস্বাভাবিকতা রয়েছে। এরা কেউই সহজে কারও সাথে মিশতে পারছে না, এমনকি আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো তাদের কোনো বন্ধুও নেই। অন্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বা সহানুভূতির মতো আবেগ খুব একটা দেখা যায় না এদের মধ্যে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, এদের প্রত্যেকেরই কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি তীব্র পর্যবেক্ষণ আছে। এই অস্বাভাবিক কৌতূহলের জন্য ডঃ অ্যাসপারগার তাদেরকে মজা করে বলতেন ‘little professor’। যাইহোক, সেই সময় তিনি এই রোগ সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে পারেননি। পরবর্তী কালে ১৯৯৪ সালে ডঃ হান্স অ্যাসপারগারের নামানুসারে এই রোগের নামকরণ করা হয় অ্যাসপারগার্স সিনড্রোম বা অ্যাসপারগার্স রোগ।

অ্যাসপারগার্স সিনড্রোম সমষ্টিগতভাবে কিছু রোগকে বোঝায়, যা প্রধানত স্নায়বিক বিকাশজনিত ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে সৃষ্টি হয়। প্রথম দিকে এই অ্যাসপারগার্স সিনড্রোমকে অটিজম বলেই মনে করা হতো। পরবর্তী কালে অ্যাসপারগার্স সিনড্রোমকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শারীরবৃত্তীয় অস্বাভাবিকতা হিসাবে ব্যখ্যা করা হলেও, এটি আসলে অটিজম রোগের ই ভিন্ন কোনো অবস্থা কিনা তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘Diagnostic and statistical manual of mental disorder’ এ অটিজম এবং অ্যাসপারগার্স সিনড্রোমকে একসাথে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হিসাবে অভিহিত করা হয়।

অটিজমের সাথে অ্যাসপারগার্স সিনড্রোমের কিন্তু মৌলিক একটি পার্থক্য রয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির বুদ্ধির বিকাশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার সাধারণের থেকেও অতিরিক্ত বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি দেখা যায় যারা অ্যাসপারগার্স রোগের শিকার। কিন্তু এদের সবথেকে বড় সমস্যা হলো, ‘social interaction’। মজার ব্যাপার হলো, এই রোগের কিন্তু বেশ ভালো কিছু দিক ও আছে। এই যেমন ধরুন,

(১) সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।

(২) স্বাধীনভাবে কাজ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারা।

(৩) মৌলিক চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা।

(৪) নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং সেই বিষয়ের ওপর অন্য মানুষের মতামতের থেকে নিজের যুক্তি ও চিন্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

অথবা

(৫) ছোট খাটো পরিবর্তন, যা অন্য সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, সেই সকল পরিবর্তনগুলিকেও সহজেই ধরে ফেলার সামর্থ্য।

কিন্তু এই ভালো দিক ছাড়াও অ্যাসপারগার্স রোগের প্রধান কিছু উপসর্গ আছে। যেমন,

১. সামাজিক সচেতনতার অভাব।

২. সামাজিক যোগসূত্র তৈরী করার অক্ষমতা।

৩. এমনকি বন্ধু বানাতে পারা অথবা বন্ধুত্ব বা অন্য যে কোনো সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা।

৪. অন্যের অনুভূতি, চিন্তা অথবা আবেগ কে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারার অপারগতা।

৫. অপর মানুষের দিকে খুব গভীর ভাবে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা অথবা চোখে-চোখ রেখে কথা বলা কে সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করা।

৬. মুখমণ্ডলে অত্যধিক অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ অথবা তার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি।

৭. শব্দ, স্পর্শ, ঘ্রান অথবা স্বাদের প্রতি অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা।

৮. ইশারার মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করতে না পারা।

৯. পরিবর্তনের প্রতি অনমনীয়তা অথবা নিয়মের প্রতি অকারণ ও অত্যধিক নির্ভরশীলতা।

১০. গতানুগতিক কিছু ‘motor pattern’। যেমন, ক্রমাগত হাত নাড়ানো।

ইত্যাদি।

অ্যাসপারগার্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ভাষা জ্ঞান কিন্তু যথেষ্ট স্বাভাবিক। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট ভাষার শব্দভাণ্ডার বা ব্যাকরণগত জ্ঞানের কোনো খামতি তাদের মধ্যে দেখা যায় না। অথচ ভাষার সঠিক ব্যবহারে অনেক সময় এদের অক্ষমতা লক্ষ করা যায়। এছাড়াও, কথোপকথনের সময় দ্রুত বিষয় পরিবর্তন করে ফেলা, কখনো কখনো খুব চিৎকার করে, নাটকীয়ভাবে কথা বলা বা অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলার মতো অস্বাভাবিকতা থাকে।

এবার আসি, এই রোগের নিরাময় কিভাবে সম্ভব তার কথায়। এই প্রসঙ্গে বলি, অ্যাসপারগার্স সিনড্রোম আছে কিনা তা জানার এক এবং একমাত্র উপায় হলো, রোগীর স্বভাব চরিত্র, তার কথা বলার ভঙ্গি, ব্যক্তিগত জীবনে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে তার দক্ষতা, সামাজিক দায়িত্ব পালনে তার ভূমিকা— এই সমস্ত কিছু বিশ্লেষণ। কোনো ল্যাব টেস্ট বা ইমেজিং এর কোনো গুরুত্ব এক্ষেত্রে নেই। যেহেতু চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনো পর্যন্ত এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই এবং শুধুমাত্র ওষুধের সাহায্যে এই রোগ নিরাময় সম্ভব নয়, তাই অ্যাসপারগার্স রোগের চিকিৎসা হিসাবে বহুমুখী পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কাউন্সেলিং এক্ষেত্রে খুব বড় ভূমিকা পালন করে। ওষুধ শুধুমাত্র অ্যাসপারগার্স রোগের উপসর্গ গুলিকে অথবা এই রোগের সাথে সম্পর্কিত কিছু মানসিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিছু ‘behavioral therapy’র কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ্য,

(১) স্পীচ থেরাপি বা ল্যাংগুয়েজ থেরাপি। এক্ষেত্রে মৌখিক থেকে লিখিত পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

(২) সামাজিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিক সচেতনতা বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। এছাড়া ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন অথবা যোগাযোগের মতো বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়।

(৩) প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সমস্যার মোকাবিলা অথবা পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মতো প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, সামাজিক, ব্যবহারিক অথবা শিক্ষাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অ্যাসপারগার্স সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে একটি সুস্থ স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপন করা সম্ভব।

এবার একটা মজার তথ্য শেয়ার করি? পৃথিবীর বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব কিন্তু এই অ্যাসপারগার্স রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন

১. চার্লস ডারউইন

২. স্যার আইজ্যাক নিউটন

৩. চার্লস রিখটার

8. আলবার্ট আইনস্টাইন

৫. ম্যারি কুরি

৬. বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

৭. আব্রাহাম লিংকন

এবং আরও অনেকে।

তথ্য সূত্র:

Asperger’s Syndrome Symptoms, Definition, Facts & Testing

Asperger’s Symptoms in Adults, Diagnosis, Treatment, and More

25 Famous People With Asperger Syndrome

10 famous people with Asperger syndrome

National Autistic Society

গুগল ইমেজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here